মিনা ও আরাফায় সালাত কসর করতে হবে নাকি পূর্ণ আদায় করতে হবে?

প্রশ্ন: হজের দিনগুলোতে মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থানকালে হাজীগণ সালাত কসর করবে নাকি পূর্ণ সালাত আদায় করবে— এ বিষয়ে কী বিধান? আর কসর করা কি হজের আমলের অংশ, নাকি সফরের কারণে? এছাড়া কোনো হাজী যদি মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কাটানো সময় মিলিয়ে মোট পনের দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করে, তাহলে কি সে মুসাফির গণ্য হবে নাকি মুকিম? এ অবস্থায় কীভাবে সালাত আদায় করবে?

উত্তর:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

এক. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজের সময় মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় সালাত কসর করেছেন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কসর কি হজের আমলের অংশ ছিল নাকি সফরের কারণে ছিল— এ ব্যাপারে ফকিহগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহর মত হলো, হজের আমলের অংশ হিসেবে নয়, বরং সফরের কারণে কসর করেছেন।

অপরদিকে কতিপয় ফকিহর মত হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজের আমলের অংশ হিসেবে কসর করেছেন। এজন্য কসর করার এ বিধান মুকিম ও মুসাফির সকল হাজীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কেউ কেউ এ মতটিকে ইমাম মালেক রহ.-এর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। তবে ইমাম মালেক রহ.-এর আল-মুয়াত্তা কিতাব থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনি আরাফা ইত্যাদির কসরকে হজ্বের আমলের অংশ মনে করতেন না, বরং সফরজনিত কসর মনে করতেন। [দ্রষ্টব্য, আল-মুয়াত্তা, ১৯৫]

এ দুটি মতের মধ্যে প্রথম মতটিই অধিকতর শুদ্ধ। এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহগণের মত। আরব ও আজমের অধিকাংশ ফকিহ এ মতানুসারে ফতোয়া দিয়ে থাকেন।

অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি আরাফা, মিনা, মুযদালিফা ইত্যাদিতে মুসাফির হন, তবে তিনি চার রাকাতবিশিষ্ট সালাত কসর করবেন। আর মুকিম হলে পুরো সালাত আদায় করবেন।

দুই. মুসাফির ব্যক্তি কোনো শহরে পনের দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করার ইচ্ছা করলে সে মুকিম গণ্য হয়। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন,

‌إذا [‌أجمع] ‌على ‌إقامة ‌خمس عشرة أتم الصلاة.

অর্থ : যখন পনের দিন অবস্থান করার ইচ্ছা করবে, তখন পূর্ণ সালাত আদায় করবে। [আল-আওসাত, ২২৬৭]

তবে যদি কেউ একাধিক স্থান মিলিয়ে ১৫ দিন বা তার বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করে, তাহলে স্থানগুলো সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র কি না— তা বিবেচনায় আনতে হবে। যদি স্থানগুলো সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র হয়, তবে মুকিম হওয়ার জন্য দুই স্থান মিলিয়ে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে না। এ বিষয়ে ফকিহ আব্দুল গনি মাইদানি রহ. বলেন—

قيدنا ببلد واحد لأنه لو نوى الإقامة في موضعين مستقلين كمكة ومنى لم تصلح نيته.

অর্থাৎ, আমরা এক শহর হওয়ার শর্ত যুক্ত করেছি। কারণ, যদি কেউ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুটি স্থানে অবস্থানের নিয়ত করে, যেমন মক্কা ও মিনা— তাহলে তার নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে না। [আল-লুবাব ফি শারহিল কিতাব, ১/১০৭]

আর যদি স্থান দুটি সম্পূর্ণ আলাদা না হয়ে একই শহরের দুটি অংশ হিসেবে গণ্য হয়, তবে এরূপ দুই স্থান মিলিয়ে পনের দিন বা তার বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করলেও সে মুকিম গণ্য হবে। ইমাম আলাউদ্দিন কাসানি রহ. বলেন—

إذَا نَوَى الْمُسَافِرُ الْإِقَامَةَ خَمْسَةَ عَشَرَ يَوْمًا فِي مَوْضِعَيْنِ فَإِنْ كَانَ مِصْرًا وَاحِدًا أَوْ قَرْيَةً وَاحِدَةً صَارَ مُقِيمًا؛ لِأَنَّهُمَا مُتَّحِدَانِ حُكْمًا

অর্থাৎ, যখন কোনো মুসাফির দুই স্থানে ১৫ দিন অবস্থান করার নিয়ত করে, যদি সেই স্থান দুটি একই শহর বা একই গ্রামের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে সে মুকিম গণ্য হবে। কারণ, স্থান দুটি বিধানগতভাবে এক স্থান হিসেবেই পরিগণিত । [বাদায়িউস সানায়ি, ১/৯৮]

ইতোপূর্বে মিনা ও মক্কা নগরী সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা ছিল। এ কারণে পূর্ববর্তী ফকিহগণ মিনা ও মক্কাকে পৃথক স্থান গণ্য করেছেন এবং মিনা ও মক্কা মিলিয়ে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়তকে মুকিম হওয়ার জন্য যথেষ্ট মনে করেননি।

কিন্তু বর্তমানে মক্কা নগরীর বসতি বিস্তৃত হওয়ার ফলে মিনা মক্কার একটি মহল্লার রূপ ধারণ করেছে। তাছাড়া প্রশাসনিকভাবেও মিনা মক্কা নগরীর অন্তর্ভুক্ত। তাই বর্তমানে মক্কা ও মিনা মিলিয়ে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করলেই ব্যক্তি মুকিম গণ্য হবে। মাঝখানে আরাফা ও মুযদালিফায় গেলেও এই বিধানে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ আরাফা ও মুযদালিফা বসবাসযোগ্য স্থায়ী বসতি নয়।

সুতরাং বর্তমানে কোনো হাজি যদি মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কাটানো সময়সহ অন্তত পনের দিন মক্কায় অবস্থান করার নিয়ত করে, তবে সে মক্কায় মুকিম গণ্য হবে এবং সালাতসহ অন্যান্য বিধান মুকিমের মতো পালন করবে।

উল্লেখ্য, পাক-ভারত ও বাংলাদেশের অনেক মুফতি এখনো মিনা ও মক্কাকে পৃথক স্থান হিসেবে গণ্য করেন। তাদের এই মতের পক্ষেও গ্রহণযোগ্য যুক্তি রয়েছে। তাই কেউ যদি তাদের মতানুসারে আমল করেন, তবে তাদেরকে সে মতানুসারে আমল করতে দেওয়া উচিত। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ানো বা বিপরীত মতের আলেমগণকে লক্ষ্যবস্তু বানানো অনুচিত।

আরও দ্রষ্টব্য, সুনানুত তিরমিযি, ৫৫৬; আল-হাবিল কাবির, ৪/১৬৯; আল-মুগনি, ৩/১৬৭; তুহফাতুল ফুকাহা, ১/১৫১; আল-বাহরুর রায়িক, ২/১৪৩; আল-বিনায়া, ৩/৩২; হাশিয়াতুত তাহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ, পৃ. ৪২৩

একই প্রশ্ন আপনার বন্ধু-প্রিয়জনদের থাকতে পারে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উত্তরটি শেয়ার করে আপনিও সদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিন

বিভাগসমূহ

Social Media

নিয়মিত ইসলামিক তথ্য পেতে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সংযুক্ত থাকুন

error: